zeor2inf.com

বিচিত্র সেই রামধনু-৯

লেখকঃ বিমল কর

‘আমি ঠিক জানি না, চোখের সামনে কী ঘটছিল। কিন্তু ঘটছিল। সেই নীল কুয়াশা গাড় হতে হতে আচমকা যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তারপর আগুনের শিখার মত জ্বলতে লাগল। অদ্ভুত দৃশ্য। সহজ নীল শিখা যদি ক্রমাগত দমকা বাতাসে কাঁপতে থাকে, যদি ঢেউয়ের মতন ফণা তুলে এক পাশ থেকে আর-এক পাশে ক্রমাগত আছড়াতে থাকেÑ কেমন লাগতে পারে।
‘ভয় পেয়ে আমি সুনন্দাকে ডাকলাম চিৎকার করে। গলা উঠল কি উঠল নাÑজানি না; কোনও সাড়া পেলাম না সুনন্দার।
‘আমার হাত-পা তখন অসাড় না আমি অচেতন অবস্থায় ছিলাম বলতে পারব না। চারপাশে কেমন এক তাপ অনুভব করছিলাম। শরীর জ্বালা করছিল। আর হঠাৎ অনুভব কলাম, আমি যেন বজ্রাহত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছ। নিজের কোনও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে আমার কোনও সাড় নেই। আমার চারপাশের তাপ বাড়তে বাড়তে অসহ্য হয়ে উঠল। গায়ের পাশে যেন চুল্লি জ্বলছে। হয়তো দরদর করে ঘামছিলাম। হয়তো গায়ের চামড়া পুড়ে যাচ্ছিল। কী যে হচ্ছিল বুঝিয়ে বলার ক্ষমতা আমার নেই। এমনকি তখন কী অনুভব করছিলামÑতাও বোঝানো যায় না।
‘আমার মনে হল, এবার আমি মারা যাব। হয়তো আর দু-চার মুহূর্ত। এখন আর আমার করল কিছু নেই। শুধু কয়েক মুহূর্ত মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করা। তাহলে কি তাই হল? এ-জীবন শুধু একটি মুহূর্ত হয়ে থাকে। কেউ আমাকে অদৃশ্য থেকে দেখল, রেসের ঘোড়ার মত আমি এক নিমেষের জন্যে তার চোখে পড়ে হারিয়ে গেলাম।
‘মৃত্যুর জন্যে আমি অপেক্ষা করছিলাম। প্রতিটি মৃত্যু-মুহূর্ত যেন জলের ফোঁটার মতন একটি একটি করে আমার মধ্যে পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কী আশ্চর্য, আমি মরছিলাম না। কেন, কে জানে।
‘ক্রমশ দেখি আমার চারপাশের তাপ কমে আসছে। দ্রুতই কমে যাচ্ছিল। আর সেই নীল শিখাও ক্রমেই মিলিয়ে আসতে লাগল। হ্যাঁ, মিলিয়ে এসে রামধুর মতন বেঁকে আকাশের দিকে উঠে গেল। তারপর মিলিয়ে গেল কোন অদৃশ্য কে জানে।
‘কী যে হচ্ছিল ঈশ্বরই জানেন। সমস্ত তাপ চলে গেল। মুখে গেল নীল শিখা। শুধু সাদা কুয়াশা ভাসতে লাগল। ঝিঁঝিঁর ডাক কানে এল।
‘তারপর দেখি, কুয়াশার মধ্যে একটি মানুষ। যেন ভেসে আছে।
‘লক্ষ করতে করতে একসময় মনে হল, কোনও মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কে? কে ও? কে? ওখানে কেন?
‘আরও কিছুটা স্পষ্ট হল মেয়েটি। সুনন্দা নাকি?
‘সুনন্দা বলেই মনে হল। কিন্তু এ কেমন সুনন্দা? ওকে লম্বা দেখাচ্ছি। ভীষণ লম্বা। যেন গাছের লম্বা পাতার মত আকৃতি। মাথার দু’পাশ থেকে চুল গড়িয়ে এসে পায়ের পাতা ছুঁয়েছে। সম্পূর্ণ নগ্ন। অথচ মাথার দু’পাশ থেকে চুল গড়িয়ে এসে পায়ের পাতা ছুঁয়েছে। সম্পূর্ণ নগ্ন। অথচ মাথার সেই বিশাল চুলÑযা দু’পাশ থেকে ওর পায়ের পাতা পর্যন্ত নেমে এসেছিলÑ সেই চুল ওর নগ্নতা ঢেকে রেখেছে।
‘সুনন্দা এগিয়ে আসছিল না। ছবির মত দাঁড়িয়ে ছিল।
‘দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে আরও দীর্ঘ হল। তারপর হারিয়ে গেল। আর তাকে দেখতে পেলাম না।
‘চারদিক স্তব্ধ। ঝিঁঝি ডাকছে। কুশাশা আর জ্যোৎস্না মিলেমিশে মিহি বৃষ্টির মতন ছড়িয়ে রয়েছে।
‘আমি জানি না, কেমন করে কখন আমি বাড়ি ফিরতে শুরু করলাম। সাধারণ সুস্থ মানুষের মত যে আমি হাঁটছি নাÑনিজেই বুঝতে পারছিলাম। আমার পা কাঁপছিল, টলছিল, হাত যেন নড়ছিল না। বুক আর মাথা অদ্ভুত লাগছিল। নিঃশ্বা প্রশ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা আমি কি হারিয়ে ফেলেছিলাম। মাথা একেবারে ফাঁকা।
‘বাড়ির কাছাকাছি এসে আমার যেন সামান্য হুঁশ হল।
‘সুনন্দা আমার পাশে পাশে রয়েছে। ও আমার কী বলছিল আমি খেয়ালই করতে পারছিলাম না।
‘প্রথম যখন খেয়াল হল আমি শুনলাম সুনন্দা বলছে, “আপনার কী হয়েছে?”
‘ওর দিকে তাকালাম। এই সুনন্দা সাধারণ সুনন্দা, যেমন তাকে আমি রোজই দেখছি। কোথাও কোনও বিকৃতি নেই।
‘“কথা বলছেন না?” সুনন্দা বলল।
‘আমি কথা বললাম। গলার স্বর কেমন শোনাল জানি না। “তুমি কোথায় ছিলে?”
“‘কখন?”
‘“আমি যখন ওই জায়গাটায় ছিলাম?’
‘“আপনি এগিয়ে গেলেন আমি বারণ করলাম। খানিকটা পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।”
‘“পাশে ছিলে না?”
‘“না।”
‘“আমি তোমায় ডেকেছিলাম। শুতে পাওনি?”
‘“না। কখন ডাকলেন?”
‘“আমি তোমায় ডেকেছিলাম।...তুমি কিছু দেখতে পাওনি?”
‘“না। কী দেখব?”
‘‘‘সেকি।...কুয়াশারা কেমন নীল হয়ে উঠল। উঠে জ্বলজ্বল করতে লাগল। শেষে আগুনের মতন...!
‘“কী বলছেন আপনি?”
‘“আমি যে দেখলাম। নীলে নীল, ফণার মতন মাথা তুলে নীলের শিখা দুলছিল। এপাশ থেকে ওপাশ...। তারপর রামধনুর মতন আকাশে...”
‘সুনন্দা হেসে ফেলল। “আপনার চোখের ভুল।”
‘“চোখের ভুল। এতবড় ভুল কেমন করে হবে। আমি যে তোমাকেও দেখলাম।”
‘“আমাকে। কোথায?”
“‘ঠিক ওইখানটায়।”
‘সুনন্দা হাসতে লাগল। বলল, “আপনার মাথা খারাপ। আমি ওখানে যাব কেন? আমি তো প্রায় বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওদিকে যেতে আমার ভয় করে। সাপখোপ, পোকামাকড়, জঙ্গল...। আপনাকে আমি বারণও করলাম যেতে।”
‘আমি অবাক হয়ে সুনন্দার মুখ দেখছিলাম। ও কি কিছুই দেখেছি? তাহলে আমি কেন দেখলাম? চোখের ভুল? মনের ভুল? মতিভ্রম।
‘“কিন্তু আমি যে নিজের চোখের সব দেখলাম, সুনন্দা। এমন আশ্চর্য অবিশ্বাস্য জিনিস আর কখনও দেখিনি। তোমায় কেমন করে বোঝাব, কী আমি দেখেছি।”
‘সুনন্দা বলল, হালকা করে, “ভুল দেখেছেন। আর আমাকে আপন দেখবেন কেমন করে। আমি অনেকটা পিছনে ছিলাম। সামনে যাইনি।”
‘“ঠিক। তবুÑ?”
‘“তবুটবু কিছু নয়।...আপনি আমায় প্রথম দেখেছিলেন কুড়ি-বাইশ বছর আগে। আমাকে আপনার বোধহয় পছন্দ হয়নি। আমার বিয়ে হয়েছিল আসানসোলে। বিয়েতেও আপনি যাননি। আর দু’যুগ পরে এখানে আমাকে দেখছেন।...আমাকে হঠাৎ অত কষ্ট করে অ-জায়গায় দেখতে যাবেন কেন।”
‘আমি আর কিছু বললাম না। সুনন্দার কথার মধ্যে খোঁচা ছিল হয়তো।
‘বাড়ি ফিরে ভালো করে চোখ মুখ ঘাড় হাত-পা ধুয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। নিজেকে অসুস্থ দুর্বল মনে হচ্ছিল। সেই কুয়াশা, নীর শিখার ঢেউ, বিচিত্র রামধনু, অসহ্য তাপ, গাছের লম্বা পাতার মতন সুনন্দার সেই অদ্ভুত চেহারা আমার মাথার মধ্যে জড়িয়ে জট পাকিয়ে আমাকে যেন পাগল করে তুলছিল।
‘রাজু তার বড় অফিসের কাজ সেরে শহর ঘুরে ফিরল, সামান্য রাত করে।
‘আমার ইচ্ছে ছিল না সেদিনই কথাটা তুলি। আমাদের দু’জনকে খেতে বসিয়ে সুনন্দাই তামাশার গলায় কথাটা তুলল।
‘রাজু বলল, “কী হয়েছে, শিবুদা?”
‘আমি যতটা পারি তাকে বললাম।’
‘রাজু সব শুনে হাসতে লাগল। বলল, “ওই জায়গাটা ডেজার্টেড। এখানকার তোলিয়ারি তোমার হয়েছিল ওখানে। সে কি আজকের কথা। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের ব্যাপার। একে কোলিয়ারি, তার ওপর আবার অনেকটা সাবসাইড করে গেছে। ওদিকে তুমি গেলে কেন? বেকায়দায় ঘিরে পড়লে ষাট-স্তর ফিট তলায় চলে যেতে। ওখানে কেউ যায় না।”

মঙ্গল গ্রহের আত্ম-প্রতিকৃতি

আরেকটি সাফল্যের গল্পঃ বাংলাদেশে ভিন্নধর্মী লেজার কন্ট্রোলার আবিষ্কার

বিচিত্র সেই রামধনু-৭

ছদ্মবেশী সুপারনোভার অস্তিত্ব

গরমের দিনে গরম লাগে কেন বা পাখার বাতাসে ঠাণ্ডা লাগে কেন?

ইন্ডাকশন হিটার কীভাবে কাজ করে ?

ভারত মহাসাগরের তলদেশে চাপা পড়ে আছে প্রাচীন মহাদেশ

চার্লস অগাস্টিন ডি কুলম্ব

জিরো টু ইনফিনিটি ফেব্রুয়ারি ২০১৪

প্রোগ্যামিং স্কুলঃ ১